Header Ads

বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র : মুখ ও মুখোশ


বাংলাদেশের প্রথম স্থানীয়ভাবে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র 'মুখ মুখোশ' সিনেমাটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুপরিচিত হয়ে আছে সফলতার এক মাইলফলক হিসেবে। 

মুখ মুখোশের প্রথম মহরত হয় হোটেল শাহবাগে, ১৯৫৪ সালের আগস্টে। তবে বাংলাদেশে নির্মিত সিনেমা হলেও এর প্রথম প্রদর্শনী হয় পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে। ঢাকায় ফিরে আসার পর প্রযোজক সংস্থা ছবিটি প্রদর্শনীর বিষয়ে বিভিন্ন হল মালিকের দ্বারস্থ হলেও, কেউ তাতে গ্রিন সিগন্যাল দেয়নি। তবে অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। তখনপাকিস্তান ফিল্ম ট্রাস্টপাকিস্তান ফিল্ম সার্ভিসছবিটি পরিবেশনার দায়িত্ব নেয়। প্রিমিয়ার শো রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত হলেও, ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে জনসাধারণের জন্য প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্রটির প্রথম প্রদর্শনী হয় মুকুল টকিজে, যা বর্তমানে আজাদ সিনেমা হল নামে পরিচিত। পুরান ঢাকার জনসন রোডে নির্মিত এই সিনেমা হল ছিল ঢাকায় নির্মিত প্রথম দশ সিনেমা হলের একটি। এই হলটিই একসময় ছিল ঢাকার অভিজাত পরিবারের সদস্যদের বিনোদনের প্রধান মিলনস্থল। এছাড়াও ১৯৩১ সালে ঢাকায় নির্মিত প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্রদ্য লাস্ট কিসএই প্রেক্ষাগৃহেই মুক্তি পায়। ওই সিনেমা দিয়েই হলটির পথচলা শুরু।

মুখ মুখোশ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালের আগস্ট। পেছনে থেকে সমস্ত নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্প প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের রূপকার আব্দুল জব্বার খান। তবে, তিনি এই সিনেমা নির্মাণের কাজে হাত লাগান ১৯৫৩ সালে। তার এই চলচ্চিত্র নির্মাণের কাহিনীটাও বেশ মজার। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ. দোসানি পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে এক নেতিবাচক মন্তব্য করে বসেন। সেই নেতিবাচক মন্তব্য দারুণভাবে আঘাত করে জব্বার খানের মনে। তারপর ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে . সাদেক একটি সভা আহ্বান করেছিলেন। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা। সভায় গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক বাহাদুর ফজল আহমেদ বলে ফেললেন, পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র আবহাওয়া চলচ্চিত্র নির্মাণের উপযুক্ত নয়। উল্লেখ্য, তিনি ছিলেন অবাঙালি। কথার শোনার সাথে সাথে কঠোর প্রতিবাদ করে বসলেন আবদুল জব্বার খান। তিনি বললেন, এখানের মাটিতেই তো ভারতীয় সিনেমার বহু শুটিং হয়েছে। তবে বাংলা সিনেমা তৈরিতে সমস্যা কোথায়? বাহাদুর ফজল আহমেদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন তিনি। বললেন, যেকোনো মূল্যেই হোক, চলচ্চিত্র বানিয়েই দেখাবেন।


তখন চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো স্টুডিও বা সুযোগ-সুবিধা ঢাকায় বিদ্যমান ছিল না। ছবিটির অর্থায়ন চিত্রায়নে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসে ইকবাল ফিল্মস্ এই ইকবাল ফিল্মস গঠিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালের দিকে, বলতে গেলে আব্দুল জব্বার খানের একক প্রচেষ্টায়। এর চেয়ারম্যান ছিলেন বলাকা সিনেমা হলের মালিক এম. . হাসান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর আবদুল জব্বার খানের সহকর্মী নুরুজ্জামান। সিনেমার শুটিং শুরু হয় ১৯৫৩ সালের একেবারে শেষ দিকে, অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসে। শুটিংয়ের জন্য বিভিন্ন জায়গা বেছে নেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সিদ্ধেশ্বরী, কমলাপুর বৌদ্ধ বিহারের পুকুরপাড়, মিরপুর তেজগাঁওয়ের জঙ্গল, বুড়িগঙ্গার ওপারে কালীগঞ্জ, তেজগাঁওয়ের জঙ্গল, জিঞ্জিরা, রাজারবাগ লালমাটিয়ার ধান ক্ষেত এবং টঙ্গীর বিভিন্ন জায়গা। ১৯৫৫ সালে শেষ হয় সমস্ত দৃশ্য ধারণ। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন অক্টোবরের ৩০ তারিখ।

অধিকাংশ জায়গা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, সর্বসাকুল্যে ছবিটির নির্মাণ ব্যয় ছিল তৎকালীন পাকিস্তানী মুদ্রায় ৬৪ হাজার রুপি। আবার আবার কোনো কোনো জায়গায় বলা আছে এর নির্মাণ ব্যয় ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি রুপিতে ৮২ হাজার। এর মধ্যে ৪২ হাজার রুপি ঢেলেছিলেন অভিনয় শিল্পী আলমগীরের বাবা কলিম উদ্দিন আহমেদ দুদু মিয়া। বাকি ৪০ হাজার দিয়েছেন তার চার বন্ধু। মুক্তির পর সিনেমাটি প্রথম দফায় নিজ ঝুলিতে পুরে নেয় প্রায় ৪৮ হাজার রুপির মতো।

আব্দুল জব্বার খান অন্য কারও কাছে ধর্না না দিয়ে নিজের লেখাডাকাতগল্পকে উপজীব্য করে গড়ে তোলেনমুখ মুখোশচলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। বলে রাখা ভালো ফরিদপুরে সংঘটিত একটি ডাকাতির কাহিনীকে কেন্দ্র করেডাকাতনামে একটি নাটক লিখেছিলেন তিনি। প্রথমে ছবির নাম রাখা হয়েছিল 'ডাকাত' পরে ফজল শাহাবুদ্দিনের পরামর্শে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'মুখ মুখোশ' তবে চিত্রনাট্য নির্মাণে নিজ নাটক 'ডাকাত' এর পাশাপাশি আব্দুল জব্বার খান পল্লীকবি জসীম উদ্দিন কাজী নজরুল ইসলামের কিছু বইকেও বেছে নেন। ডাকাত নাটকের পাণ্ডুলিপি নিয়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেসময় তার সাথে ছিলেন কিউ এম জামান, যিনি প্রথমদিকে সিনেমাটির চিত্রগ্রহণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।


তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ইস্কান্দার মির্জা সিনেমার মহরতের উদ্বোধন করেন। মহরতে বাবাকে নিয়ে গিয়েছিলেন জহরত আরা। শোনা যায়, মহরত অনুষ্ঠানের আগে বিপুল বর্ষণে শাহবাগ এলাকায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে গিয়েছিল। গভর্নর ইস্কান্দার মীর্জা এর মধ্যেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ছবির প্রথম প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরেবাংলা . কে. ফজলুল হক।

মুখ মুখোশের নির্মাণ কথা যেন আপাদমস্তক এক রূপকথার গল্প। একদম শূন্য হাতে শুরু করেছিলেন আবদুল জব্বার খান তার দল। তারপর শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তিল তিল করে নির্মাণ করেছেন অধরা সেই স্বপ্নকে। মুক্তি দেয়ার পর টানা চার সপ্তাহ হাউজফুল ছিলমুখ মুখোশ সিনেমা আরও দীর্ঘদিন চলতোকিন্তু হলের বুকিং ছিল চার সপ্তাহের জন্য বরাদ্দ। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালেআকাশ মাটি’, ‘মাটির পাহাড়’, ‘জাগো হুয়া সভেরা’, ‘এদেশ তোমার আমার; ১৯৬০ সালেরাজধানীর বুকেএবংআসিয়ামুক্তি পেতে থাকে ক্রমে ক্রমে। ভেঙে যেতে থাকে বাধার সকল গণ্ডি। এরপর থেকে প্রতি বছরেই মুক্তি পেয়েছে চলচ্চিত্র, চলছে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। 'মুখ মুখোশ' হল বাংলাদেশি চলচ্চিত্র শিল্পের উজ্জ্বল পথপ্রদর্শক। যতদিন বাংলাদেশের সিনেমার ইন্ডাস্ট্রি থাকবে, ততদিন ধ্রুবতারার মতো প্রজ্বলিত থাকবে 'মুখ মুখোশ' এর নাম।




Powered by Blogger.