ঝুঁকিতে রয়েছে বর্তমান প্রজন্ম
আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অসংক্রামক (উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হার্ট এ্যাটাক, ডায়াবেটিস,ডিজলিপিডেমিয়া,ক্যান্সার ইত্যাদি) রোগে মৃত্যু বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। ঝুঁকিতে রয়েছে বর্তমান প্রজন্ম। বয়স যখন চল্লিশের কোঠায়, দেখবেন অতি দ্রুত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসে ভুগবে বর্তমান সময়ে বেড়ে ওঠা অধিকাংশ নারী পুরুষ।
আসুন জেনে নেই কারণ গুলোঃ
১) খাদ্যাভ্যাসঃ
রেস্টুরেন্টে পার্টির পরিমাণ বেড়ে গেছে।বাড়ছে চাইনিজ খাবার ও ফাস্ট ফুড খাওয়ার প্রবণতা। বাড়ছে প্রসেস ফুড খাওয়ার প্রবণতা।যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে বিশ্বে প্রতি পাঁচজনের একজন মারা যাচ্ছে বাজে খাদ্যাভ্যাসের কারণে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ৩০০ জনের বেশি মারা যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত মাংস, লবণ ও চিনি গ্রহণই এর বড় কারণ। বিশ্বে মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কম খাচ্ছে। বেশি গ্রহণ করছে ক্ষতিকর খাবার। মানুষ প্রয়োজনীয় খাবারের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় খাবার খাচ্ছে বেশি। সহনীয় মাত্রার চেয়েও গড়ে ১০ গুণ বেশি পান করছে মিষ্টিজাতীয় পানীয়। নিরাপদ মাত্রার চেয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮৬ শতাংশ লবণ বেশি খাচ্ছে। স্বাভাবিকের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি খাচ্ছে লাল মাংস। বেশির ভাগ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নেই শস্যদানা, ফল, বাদাম বা বীজজাতীয় স্বাস্থ্যকর খাবার। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্যও একটি বড় কারণ। দরিদ্র মানুষ গড়ে পাঁচ দিনে এক দিনও ফল বা সবজি থাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। গবেষকরা বলছেন, বিশ্বে বছরে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে শুধু খাদ্যাভ্যাসের কারণে। এর মধ্যে এক কোটি মানুষই মারা যায় হৃদরোগজনিত কারণে। এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয় খাবারে অতিরিক্ত লবণ থেকে। কেননা অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বৃদ্ধি করে- যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। লবণ হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পক্ষান্তরে সবজি, শস্যদানা কিংবা বীজজাতীয় খাবার হৃদেরাগজনিত সমস্যার ঝুঁকি কমায়। এছাড়া খাদ্যাভ্যাসজনিত কারণে অন্য যেসব রোগে মৃত্যু হয় তার মধ্যে অন্যতম ক্যান্সার ও টাইপ টু ডায়াবেটিস। বাংলাদেশে ১৭ থেকে ৩৪ বছর বয়সের ২৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় টাইপ টু ডায়াবেটিসে। এর বাইরে আছে হৃদেরাগে মৃত্যুঝুঁকি। ২০১৭ সালে খাদ্যাভ্যাসজনিত কারণে যেসব দেশে প্রতি লাখে ৩১৩-৩৯৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে। এ তালিকায় ভারত, চীন ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশেরও নাম আছে।
বস্তুত: সুস্থভাবে বাঁচতে এবং মৃত্যুঝুঁকি এড়াতে বিশেষজ্ঞরা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে আসছেন অনেক দিন ধরেই৷ এর আগে ল্যানসেটের একটি প্রতিবেদনে লাল মাংস ও চিনি খাওয়ার গড় পরিমাণ অর্ধেক কমিয়ে দেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা সবজি, ফল, এবং বাদাম জাতীয় খাবার দ্বিগুন গ্রহণ করার কথা বলেন৷
২) অনিদ্রাঃ
আমরা রাত ২ টার আগে ঘুমাই না। যা আমাদের শরীরকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে।বাড়ছে নানা অসুখের ঝুঁকি। প্রতিদিন রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আর কম ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটা কতোটা ক্ষতিকর তা সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দ্য স্লিপ কাউন্সিলের ওই গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বা তার চেয়ে কম ঘুমান। ফলে তাদের শরীর, মন ও মস্তিষ্কে এর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। আর হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, যারা দিনে আট ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। কারণ অপর্যাপ্ত ঘুম অস্বাভাবিক মৃত্যুর আশঙ্কা ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। অপর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা রাতে গড়ে ৬ ঘণ্টা করে ঘুমান, তাদের কোমরের মাপ যারা ৯ ঘণ্টা করে ঘুমান তাদের চেয়ে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার বেশি। তাই রাতে ঠিকমতো ঘুম না হলে এখনই সাবধান হোন।
চলুন জেনে নিই কম ঘুমানোর ক্ষতিকর দিকগুলোঃ
১. কম ঘুমালে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগার কারণে স্বাস্থ্য মোটা হয়ে যায়। দেখা দিতে পারে টাইপ-২ ডায়াবেটিসও।
২. কম ঘুমে শরীরে HDL কোলেস্টেরল বা 'গুড কোলেস্টেরল' বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
৩. দীর্ঘদিন ধরে ঘুম কম হলে ক্যানসারের আশঙ্কাও বাড়ে।
৪. নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের নানা ধরনের জটিল রোগ দেখা দিতে পারে।
৫. এছাড়া কম ঘুমালে মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ ভুগতে পারেন আপনি।
৬. যারা কম ঘুমান অল্পতেই রেগে যাওয়া বা সারাক্ষণ মন খারাপের অনুভূতি দেখা যায় তাদের মধ্যে।
৭. ঘুম কম হলে অবসাদে ভুগতে পারেন আপনি।
৮. কম ঘুমের ফলে চট করে ঠান্ডা লাগার সমস্যা দেখা যায়।
তাই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ু জীবনের জন্য নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস করুন। প্রতিদিন রাতে আগে আগে ঘুমাতে যান, ভোরে ঘুম থেকে জাগুন। আর দীর্ঘদিনে অনিদ্রা বা কম ঘুমের সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৩) কায়িক শ্রমের অভাবঃ
স্মার্ট ফোন আমাদের অলস বানিয়ে দিয়েছে।একজন সুস্থ্য স্বাভাবিক মকনুষের প্রতিদিন প্রায় ৫০০০ধাপ হাঁটা উচিত।কিন্তু আমরা তা করছি না। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস (ন্যাশ) বা ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত। সঠিক সময়ে প্রতিরোধ না করলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের মতো মরণঘাতী রোগের কারণ হতে পারে এই লিভারজনিত রোগটি। রোগটি বাংলাদেশে খুব পরিচিত না হলেও এতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও অপর্যাপ্ত শারীরিক শ্রমের কারণে হওয়া রোগটিতে মানুষের লিভারে চর্বি জমে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। প্রাথমিকভাবে কোনো লক্ষণ না থাকায় একসময় মারাত্মক আকার ধারণ করে ও অন্যান্য লিভারজনিত জটিল রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘কায়িক শ্রমের অভাব ও ফাস্টফুড জাতীয় খাদ্যের কারণে রোগটি দেখা দেয়। তাছাড়া খাদ্যে ও ওষুধে ভেজালের কারণেও এই রোগ হয়ে থাকে। হাঁটাহাঁটি না করা, ভেজাল ও ভাজাপোড়া খাদ্য গ্রহণ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, কর্পোরেট কালচার এই রোগের কারণ। উন্নত বিশ্বে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফাস্টফুডের ক্ষতিকর দিক নিয়ে অনেক সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে ওদিকের (উন্নত বিশ্বের) ব্যবসায়ীরা এখন বাংলাদেশের দিকে ফাস্টফুডের বাজার সৃষ্টিতে মনোযোগ দিচ্ছে। আমাদেরও উচিত সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও সতর্ক থাকা।
৪) এ্যালকোহল সেবনঃ
এ্যালকোহল ছাড়া এখন পার্টি হয় না। এ্যালকোহল গ্রহণের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।যাতে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে যুব সমাজ। সভ্যতার প্রায় প্রথম দিক থেকেই যা মানব জাতির জীবন যাত্রার সংগে জড়িয়ে গেছে! উৎসবে বা বিজয়ের আনন্দে শ্যাম্পেনের ফেনায় ভেসে যাওয়া দেখে অনেকেই ‘উত্তেজিত বোধ করতে পারেন, উৎসাহিত হতে পারেন। মানুষ যা দেখে- ভাল লাগলে তা অনুসরণ করে! তরল এ পদার্থ যারা পান করেছেন, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ‘অনুভূতি উচ্চমার্গে উঠে যায়। কম কথা বলা মানুষও প্রগলভ হয়ে উঠেন! কিন্তু মনে রাখা দরকার, এ তরলটি আসলে বিষ ! অনেক স্নায়ুবিক রোগ সৃষ্টিকারী এবং মানব শরীরে প্রায় ২০০ রোগের উৎপত্তিতে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে! অ্যালকোহলের প্রভাবে ক্যান্সার হয়- এ কথা ৭০ ভাগ মানুষ জানেই না! আমরা যারা ‘নিষিদ্ধ বস্তু’ বলে দূরে থাকি, তাদের বাদ দিয়েই এ পরিসংখ্যান। গলা দিয়ে নীচের দিকে নামার আগেই মুখের মিউকাস মেমব্রেনে অ্যালকোহল শোষিত হওয়া শুরু করে এবং শেষ অবধি রক্তে মিশে যকৃতে গিয়ে উপস্থিত হয়! যকৃত হচ্ছে প্রথম যাত্রাবিরতি, যকৃতের এনজাইম অ্যালকোহলকে বিভাজিত করে। হাইডেলবার্গের এক গবেষক হেলমুট শিৎজ বলেন, ‘যকৃতের একটা কাজ হল শরীর থেকে বিষ শুষে নিয়ে তা বাইরে বের করার ব্যবস্থা করা, অ্যালকোহল সেই বিষগুলোর একটা! কিন্তু যকৃতে এর ভাঙন সম্পূর্ণ হয় না, অন্য অঙ্গেও গিয়ে পৌঁছে কিছুটা ! পিত্তাশয়, মাংসপেশী ও হাড়ে পর্যন্ত এর ‘বিষময় প্রভাব গিয়ে পৌঁছে”!
উপরোক্ত কাজগুলোর মাধ্যমে আমরা আমাদের অল্প বয়সে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন রকমের অসংক্রামক রোগের বীজ বপন করে ফেলছি।তাই সময় থাকতে সচেতন হোন।

.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
No comments